১৩৫০ বঙ্গাব্দের দুর্ভিক্ষ নিয়ে রচিত উপন্যাস কোনটি?
সঠিক উত্তর হলো খ. অশনি সংকেত।
ব্যাখ্যা:
- 'অশনি সংকেত' উপন্যাসটি বিখ্যাত সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক রচিত। এই উপন্যাসে ১৯৪৩ সালের (১৩৫০ বঙ্গাব্দ) ভয়াবহ মন্বন্তর বা দুর্ভিক্ষের মর্মস্পর্শী চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকারের ভুল নীতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট এই দুর্ভিক্ষে বাংলার গ্রামীণ জনপদের মানুষের অসহায়ত্ব, ক্ষুধা, মৃত্যু এবং সামাজিক অবক্ষয় অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
- উপন্যাসটি মূলত গ্রামীণ ব্রাহ্মণ দম্পতি গঙ্গাচরণ ও অনঙ্গবৌ-এর জীবনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে, যেখানে দুর্ভিক্ষের আগমনী বার্তা এবং তার ভয়াবহ পরিণতি ধীরে ধীরে তাদের জীবনে নেমে আসে।
- অন্যান্য বিকল্পগুলো এই প্রশ্নের সাথে প্রাসঙ্গিক নয়:
- ক. ইছামতি: এটিও বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস, তবে এর মূল বিষয়বস্তু ইছামতী নদীর তীরবর্তী গ্রামীণ জীবন ও প্রকৃতি, দুর্ভিক্ষ নয়।
- গ. আরণ্যক: এটিও বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস, যা অরণ্য ও প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক এবং অরণ্য জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত।
- ঘ. বিষাদসিন্ধু: এটি মীর মশাররফ হোসেন রচিত একটি ঐতিহাসিক-ধর্মীয় উপন্যাস, যা কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনা নিয়ে লেখা। এর সাথে ১৩৫০ বঙ্গাব্দের দুর্ভিক্ষের কোনো সম্পর্ক নেই।
💡 মনে রাখার টেকনিক / শর্টকাট:
১৩৫০-এর দুর্ভিক্ষে অশনি সংকেত, বিভূতিভূষণ দিলেন সেই ক্ষেত (ক্ষেত্র/পটভূমি)।
১৩৫০ বঙ্গাব্দের দুর্ভিক্ষ, যা ১৯৪৩ সালের বাংলা মন্বন্তর নামে পরিচিত, বাংলার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সৃষ্ট এই দুর্ভিক্ষে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ অনাহারে ও অপুষ্টিতে মারা গিয়েছিল। এটি কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না, বরং ব্রিটিশ সরকারের যুদ্ধকালীন নীতি, খাদ্যশস্য মজুতকরণ, কালোবাজারি এবং ত্রাণের অব্যবস্থাপনা এর প্রধান কারণ ছিল। এই ভয়াবহ ঘটনা বাংলা সাহিত্য ও শিল্পকলায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
- 'অশনি সংকেত' (১৯৪৪): বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই উপন্যাসটি দুর্ভিক্ষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম। সত্যজিৎ রায় ১৯৭৩ সালে এই উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে একই নামের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়। চলচ্চিত্রটি গ্রামীণ বাংলার দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা এবং মানুষের অসহায়ত্বকে অত্যন্ত নিপুণভাবে তুলে ধরেছে।
- অন্যান্য সাহিত্যকর্ম ও শিল্পকলা:
- তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়: তাঁর 'মন্বন্তর' উপন্যাসটিও ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে রচিত। এটি দুর্ভিক্ষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব এবং মানুষের নৈতিক অবক্ষয়কে তুলে ধরে।
- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: তাঁর ছোটগল্প 'দুর্ভিক্ষ' এবং উপন্যাস 'আহুতি'-তেও দুর্ভিক্ষের চিত্র পাওয়া যায়।
- সুবোধ ঘোষ: তাঁর 'ফসলের ডাক' উপন্যাসেও দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপট রয়েছে।
- জয়নুল আবেদীন: বিখ্যাত চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদীন তাঁর 'দুর্ভিক্ষের স্কেচ' (Famine Sketches) সিরিজের মাধ্যমে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেন। তাঁর আঁকা ছবিগুলো দুর্ভিক্ষের নির্মম বাস্তবতার এক জীবন্ত দলিল।
- বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাস:
- পথের পাঁচালী (১৯২৯): গ্রামীণ বাংলার জীবন, অপু ও দুর্গার শৈশব এবং প্রকৃতির সাথে তাদের নিবিড় সম্পর্ক।
- অপরাজিত (১৯৩২): অপুর কৈশোর থেকে যৌবন পর্যন্ত জীবনযাত্রা, শিক্ষা ও কর্মজীবনের সংগ্রাম।
- আরণ্যক (১৯৩৯): অরণ্য ও প্রকৃতির প্রতি লেখকের গভীর ভালোবাসা এবং অরণ্যচারী মানুষের জীবনযাপন।
- ইছামতি (১৯৫০): ইছামতী নদীর তীরবর্তী গ্রামীণ জীবন, জমিদারী প্রথা ও সামাজিক পরিবর্তন।
- মীর মশাররফ হোসেনের 'বিষাদসিন্ধু' (১৮৮৫-১৮৯১): এটি বাংলা সাহিত্যের একটি ক্লাসিক উপন্যাস। কারবালার যুদ্ধ এবং ইমাম হোসেনের শাহাদাতকে কেন্দ্র করে রচিত এই উপন্যাসে মুসলিম ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বর্ণিত হয়েছে। এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম দিকের মুসলিম লেখকদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি।
এই প্রশ্নটি BCS, ব্যাংক এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বাংলা সাহিত্য ও বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে প্রায়শই আসে। তাই ১৩৫০ বঙ্গাব্দের দুর্ভিক্ষ এবং এর উপর ভিত্তি করে রচিত সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি।